পৃথিবীর মাটিতে যেকোন জাতিরই তার চলার পথের ভাঙা-গড়া, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, সভ্যতার ক্রমবিকাশ প্রভৃতি প্রায় সব কিছুরই একটা প্রত্যক্ষ ছাপ লক্ষ করা যায় সেই জাতির মাতৃভাষার ওপর। অর্থাৎ ভাষার ওপর গবেষণা করলেই সেই জাতির ইতিহাসের একটা চিত্র ফুটে ওঠে। আমাদের বাঙালী জাতিটির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপটিকে বলা হয়েছে সংস্কৃতাশ্রয়ীই ছিল। ফলতঃ সংস্কৃত প্রাধান্যযুক্ত হওয়ায় তাকে বাংলা ভাষা বলতে অনেক পণ্ডিতের অসুবিধে হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে ভাষাবিদ শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার একটি উদাহরণ সামনে এনেছেন। শুদ্ধোদনতনয় শাক্য সিংহের বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণের কাহিনী উপস্থাপিত ক’রে তিনি বাংলার প্রাচীনত্বকে দৃঢ়ভূমিতে স্থাপিত করেছেন। বৌদ্ধশাস্ত্রে এই কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে। ভগবান বুদ্ধ ছিলেন আড়াই হাজার বছরেরও কিছু আগে। তিনি যখন বাংলা ভাষা চর্চা করেছেন তখন সহজেই অনুমেয় যে ভাষাটির ইতিহাস তিন হাজার বছরেরও বেশী। আর কোন জাতির বয়স খুব স্বাভাবিক ভাবেই তার ভাষার চেয়ে বেশী হবেই। তাই শ্রী সরকারের দেখান এই দৃষ্টান্ত থেকে আমরা বাঙালী জাতির বয়স সাড়ে তিন হাজার বা তার বেশী ধরতেই পারি। এছাড়া হিন্দু-বৌদ্ধ যুগে গৌপভূম রাজ্যের রাজা ইছাই ঘোষ তাঁর রাজকার্য বাংলা ভাষায় পরিচালনা করা শুরু করেন। তিনি ছিলেন চর্যপদ আমলে প্রাক্ পাঠান যুগের রাজা। আর তেরশ’ বছর আগের চর্যাপদেও বঙ্গাল শব্দ জ্বলজ্বল করে দেদীপ্যমান।
বাঙালী জাতির প্রাচীনত্ব ও বাঙলার ভৌগোলিক অবস্থান প্রসঙ্গে পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতেরা বলেন ‘বাঙ্গালা’ শব্দটি তুর্কীরাই প্রথম ব্যবহার করেন সাতশ বছর আগে। এখানেও শ্রী সরকার তাঁদের সবাইকে অবাক ক’রে দিয়ে বলেছেন- চার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগেকার প্রাচীন রোমক লিপিতে বাংলাকে ‘বাঞ্জাল’ ও চীনা লিপিতে ‘বাঞ্জালা’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুতরাং বাঙলা ও বাঙালীর বয়স পাঁচ হাজার বছরের বেশী।
চারটি বেদের মধ্যে সব শেষে অথর্ব বেদ সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে আর্যরা এ দেশে প্রবেশ করা শুরু করেছিল প্রায় পনের হাজার বছর আগে। এই সময়টা ছিল ঋক বেদের রচনা কাল। তাই ঋক বেদের অধিকাংশটাই তৈরী হয়েছে ভারতের বাইরে। ঋক বেদের শেষের অংশ যখন তৈরী হচ্ছে তখন আর্যরা ভারতে প্রবেশ করা শুরু করছে। তেমনই অথর্ব বেদ যখন তৈরী হয় তখন আর্যরা মধ্য ভারত অতিক্রম ক’রে পূর্ব ভারতে এসে গেছে। তাই অথর্ব বেদের পুরোটাই তৈরী হয় ভারতের মধ্যেই। আর সেই সময়কালটা ধরা হয় প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই অথর্ব বেদে আর্য ও নার্য সংস্কৃতির সংমিশ্রণ লক্ষণীয়। শ্রী সরকার অথর্ব বেদে বাঙালী জাতির উল্লেখ থাকাকে দেখিয়ে আরও একবার বাঙালী জাতির প্রাচীনত্বের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন।
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকারের কথায়-
“….হটাৎ জেগে ওঠা নোতুন একটা বাউন্ডারী পাওয়া এই জনগোষ্ঠীটা নয়; এর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙ্গাগড়া অনেকবার হয়েছে, কিন্তু জনগোষ্ঠীটা অনেক দিনের পুরোনো বলেই এর ঐতিহাসিক অগ্রগতি হয়েছে ধাপে ধাপে। সে অনেক কিছু অনেকের থেকে নিয়েছে। অনেক কিছু অনেককে দিয়েছেও, যে জন্য তার নিজস্ব পোষাক রয়েছে, মেয়েদের শাড়ী পরবার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে, এর নিজস্ব পঞ্জিকা রয়েছে, ভাষা রয়েছে, লিপি রয়েছে, উচ্চারণ রীতি রয়েছে, একটা বিশেষ ধরণের সামাজিকতা রয়েছে। এতগুলো বৈশিষ্ট আমি যতদূর জানি, আর কোন জনগোষ্ঠীর নেই।”
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.