বাঙলা- পৃথিবীর মানচিত্রে একটি ঐতিহ্যবাহী নাম। গণ্ডোয়ানাল্যান্ডের পূর্ব প্রত্যন্তসীমা তথা জম্বুদ্বীপ ও সুবর্ণদ্বীপের প্রত্যন্তসীমায় অবস্থিত সুজলা-সুফলা ভূ-খণ্ডের নাম বাঙলা। বাঙলা একটি দেশ। মহান দার্শনিক শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার তাঁর “বাংলা ও বাঙালী” গ্রন্থের পৃষ্ঠা ১২৩-এ লিখেছেন- বাঙলার বাইরে দেশটি অতি প্রাচীনকালে গৌড় দেশ বা পঞ্চগৌড় নামে পরিচিত ছিল। বৌদ্ধ যুগ থেকেই ‘বঙ্গাল’ শব্দটি চলে এসেছিল যার ভাবরূড়ার্থ হ’ল বঙ্গের কাছাকাছি জায়গা । ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’তে বেতাল, মহারাজ বিক্রমাদিত্যকে বলছেন- “মহারাজ, গৌড় দেশের বর্দ্ধমান নগরে…..”। ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চ্য’-এ রয়েছে, “ভু-সু-কু আজ তু বঙ্গালী ভইলা”। কেউ কেউ ভাবেন, পাঠান যুগ থেকে দেশটির নাম ‘বঙ্গাল’ হয়েছে । না, তা ঠিক নয় ।
চীনা ভাষায় গত পাঁচ হাজার বছর থেকে আমাদের এই গৌড়দেশকে বলা হয়েছে বাঞ্জালা ।লাতিনে এই দেশকে বলা হয় ‘বাঞ্জাল’ (বাঙলায় জাত এই অর্থে লাতিন ভাষায় বলা হয় ‘বাঞ্জালাইটিস’), তুর্কীতে বলা হয় ‘বঙ্গালা’ আরবীতে ‘বাঙ্গালা’ (প্রাচীণ আরবীতে ‘গ’ ও ‘জ’ এর পার্থক্য স্বীকৃ্ত ছিল না, যেমন গবাহর/জবাহর – দুই-ই চলত। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য ভাষাগুলির ওপরেও এর প্রভাব পড়েছিল), ফার্সী, উর্দু ও হিন্দীতে ‘বঙ্গাল’, ইংরাজীতে ‘Bengal’, সংস্কৃতে‘গৌড়দেশ’, বাংলায় বলা হয় ‘বাঙলাদেশ’।”
আমাদের বাঙলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী নাম হচ্ছে ‘গৌড়দেশ’। এককালে এই দেশ বিভিন্ন প্রকার গুড়, যেমন আখের গুড়, খেজুর গুড়, তাল গুড়, নারকেল গুড়, গোল গুড়, শাঁকালু গুড়, মহুল গুড় তথা পাটাশ্যাওলার সাহায্যে গুড় থেকে তৈরী বিভিন্ন মানের নানান প্রকারের চীনী তৈরী ও মিশর-ইউরোপ-চীন ইত্যাদি দেশে বিক্রির জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিল বলে একে গৌড়দেশ নাম দেওয়া হয়েছিল। আমাদের গৌড়দেশ আবার পঞ্চগৌড় নামেও প্রসিদ্ধ ছিল। তার কারণ গৌড়দেশের পাঁচটি মৌলিক বিভাজন ছিল। প্রথম ও সর্ববৃহৎ ছিল রাঢ়, দ্বিতীয় অংশ ছিল সমতট, তৃতীয় অংশ বরেন্দ্র (বরীন্দ্র), চতুর্থ অংশ বিদেহ বা মিথিলা ও পঞ্চম অংশ বঙ্গ (ডবাক)।
১) রাঢ় - ভাগীরথীর পশ্চিম তীর অর্থাৎ আজকের মেদিনীপুর (পূর্ব ও পশ্চিম), হাওড়া, হুগলী, বর্দ্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মুর্শিদাবাদ, দুমকা, সাহেবগঞ্জ, দেবঘর, গড্ডা, ধানবাদ, পুরুলিয়া, সিংভূম, ভঞ্জভূম, রাঁচীর পূর্বাংশ ও গিরিডির দক্ষিণ-পূর্বাংশ।
২) সমতট বা বাগড়ি - গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ এলাকা ; বর্তমান মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, কলিকাতা, খুলনা, যশোর, কুষ্ঠিয়া, গোয়ালন্দ, গোপালগঞ্জ, পাটুয়াখালি প্রভৃতি জেলা বা জেলাংশ।
৩) বরেন্দ্র (বরীন্দ্র) – সমতটের উত্তরে অর্থাৎ গ্নগা-পদ্মার উত্তর তীরে ও কোশী নদীর পূর্বতীরে বরেন্দ্র। বাঙলার উত্তর অংশকে বরেন্দ্র বলা হয়। বরেন্দ্র ভূমির উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে গ্নগা-পদ্মা, পূর্বে যমুনা ও নূতন ব্রহ্মপুত্র আর পশ্চিমে কোশী নদীর পুরোনো খাত। এককালে বরেন্দ্রর ছিল দু’টি ভুক্তি (জেলা)- উত্তরাংশে ছিল কামতাপুর ভুক্তি; যার অন্তর্ভুক্ত ছিল পূর্বতন গোয়ালপাড়া জেলা, বর্তমান জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, রংপুর জেলা, দিনাজপুর (উত্তর/দক্ষিণ) জেলা, দার্জিলিং জেলার সমতল অংশ, কিষাণগঞ্জ ও নেপালের ঝাঁপা জেলা ; আর ছিল পৌন্ডবর্ধন ভুক্তি- যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বর্তমানের বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, মালদা প্রভৃতি জেলা।
৪) বিদেহ বা মিথিলা – পদ্মা বা গ্নগার উত্তর তীরে, কিন্তু কোশী নদীর পশ্চিম তীরে বিদেহ বা মিথিলা বা তিরহুত।
৫) বঙ্গ বা ডবাক - বরেন্দ্র ও সমতটের পূর্বদিকের অতিমাত্রায় নদীমাতৃক অংশকে বলা হয় সমতট বা ডবাক। বঙ্গের উত্তরে বর্তমানে মেঘালয় (মেঘালয়ের গারো পাহাড় এলাকাটি এককালে ময়মনসিং-য়ের সুষঙ্গ রাজ্যের অধীন ছিল),পূর্বে কখনও মেঘলা, কখনও আরাকান ইওমা পর্বত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিমে মধূমতী ও যমুনা। এলাকা – ঢাকা, ময়মনসিং, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি, কুমিল্লা, ফরিদপুর জেলা, পূর্বতন উপবঙ্গ বা চট্টল বা ত্রিপুরা বা শ্রীভূমি অর্থাৎ শ্রীহট্ট (বর্তমান ত্রিপুরা / করিমগঞ্জ / হাইলাকান্দি / কাছাড় / উত্তর কাছাড়)।
তুলনামূলক বিচারে রাঢ় ছিল সর্ববৃহৎ ; মিথিলা ছিল সবচেয়ে ছোট। রাঢ়ের ভুক্তি (জেলা) ছিল ২টি। উত্তরাংশ নিয়ে বর্ধমান ভুক্তি (বর্ধমান বিশ্বের প্রাচীনতম শহর), দক্ষিণাংশে অর্থাৎ সম্পুর্ণ মেদিনীপুর জুড়ে ছিল দন্ডভুক্তি। বরেন্দ্রেরও ছিল ২টি ভুক্তি । উত্তরাংশ নিয়ে কামতাপুর ভুক্তি ও দক্ষিণাংশ নিয়ে পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তি।
We use cookies to analyze website traffic and optimize your website experience. By accepting our use of cookies, your data will be aggregated with all other user data.